সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

পাবনায় শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে নিখোঁজ জাহিদের লাশ নিয়ে রহস্য, পরিবারের দাবি হত্যা

 

ছবিতে- জাহিদ ও তার স্ত্রী ছালমা 

বিশেষ প্রতিনিধি : গত ২৩ মার্চ পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার সিলন্দা বাজার এলাকায় বড়াল নদীতে ভেসে আসে একটি লাশ। পরে জানা যায়, পাবনার চাটমোহর উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়নের অমৃতকুন্ডা হাটপাড়া গ্রামের কাজেম প্রামাণিকের ছেলে জাহিদ হাসানের (৩৫) লাশ। তবে এই মৃত্যু নিয়ে নানান গুঞ্জণ সৃষ্টি হয়। এটা কি আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যা এ নিয়ে জনমনে যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে তা এখনও অমিমাংসীত।

জানা যায়, শেষ রোজার দিন (২০ মার্চ) শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পর নিখোঁজ হন জাহিদ হাসান। শ্বশুরবাড়ির এলাকার মসজিদ থেকে ইফতার গ্রহণের পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা। অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার সন্ধান মেলেনি। নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর, সোমবার (২৩ মার্চ) দুপুর ১টার দিকে সাঁথিয়া উপজেলার সেলুন্দা বাজার এলাকার নলভাঙ্গা পাড়া ঘাটের কাছে তার লাশ ভাসতে দেখেন স্থানীয় মাঝি নাগ ডেমরা ইউনিয়নের মজিদ সর্দারের ছেলে মিস্টার সরদার (৪১)। মিস্টার সরদার বলেন, মানুষের মরদেহ ভেসে যেতে দেখে পুলিশে খবর দিলে তারা এসে মরদেহ উদ্ধার করে।

এলাকাবাসীর মধ্যে এ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ বলেন, লাশটি দূর থেকে ভেসে এসেছে। আবার অনেকের ধারণা, তাকে হত্যা করে পানির নিচে চাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল, পরে দেহ ফুলে ওঠায় তা ভেসে উঠে।

মৃত জাহিদের বাবা কাজেম প্রামাণিক অভিযোগ করেন, তার পুত্রবধূ ছালমা খাতুন পরকীয়ায় জড়িত এবং জাহিদের নামে থাকা জমি নিজের নামে লিখে নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। এছাড়া মৃত্যুর আগে জাহিদ আশা সমিতি থেকে প্রায় ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই টাকা আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে ছালমা তার সহযোগীদের নিয়ে পরিকল্পিতভাবে জাহিদকে হত্যা করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।

জাহিদের শ্বশুর বাড়ি এলাকার ধুলাউরি ইউনিয়নের রূপসী মৌজা বাউশগাড়ী গ্রামের মৃত মকসেদ প্রামাণিকের ছেলে এবং ছালমার প্রতিবেশী চাচা আরিফুল ইসলাম (৩৬) বলেন, “আমি আগে সর্বহারা গ্রুপে থেকে খারাপ মানুষ ছিলাম, এখন আত্মসমর্পণ করে ভালো হয়ে গেছি। তিনি মৃত জাহিদের বিষয়ে দাবি করেন, “জাহিদ মানসিক রোগী ছিল।” জাহিদ নিখোঁজের রাতে তিনি কোথায় ছিলেন? এমন কথা জানতে চাইলে আরিফুল বলেন, “আমি তেবাড়িয়ায় আমার নানার বাড়িতে ছিলাম। ঈদের দুই দিন পর বাড়ি এসে জাহিদের মৃত্যুর খবর পাই।”

এদিকে জাহিদের বাবা আরিফুল ইসলামকে প্রধান সন্দেহভাজন দাবি করে আদালতে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এবং তার বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ঈদের সময় নিজের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি পাশে থাকা সত্ত্বেও নানার বাড়িতে ঈদ করা সন্দেহজনক।

ছালমার মা ফিরোজা খাতুন (৫০) বলেন, “আমি জাহিদকে কবিরাজ দেখাতে এখানে নিয়ে এসেছিলাম। পরে আমি ছালমার বাসায় যাই।” তবে কোন কবিরাজকে দেখানো হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জাহিদের বাবা-ভাইই সেটা বলতে পারবে, আমি কাউকে দেখাইনি।”ছালমার ভাই সুরুজ প্রামাণিক বলেন, “পাশের পাড়ার এক মহিলা আমাদের জানান যে, জাহিদের লাশ পাওয়া গেছে। আমরা ফোনে ছবি দেখি, কিন্তু ঘটনাস্থলে যাইনি।”

অভিযুক্ত স্ত্রী ছালমা খাতুন মুঠোফোনে বলেন, আমার স্বামী প্রায়ই বলতো সে আর বাঁচবে না, বেহেশতে যাবে এবং আমাকেও নিয়ে যাবে। তার দুনিয়া ভালো লাগতো না। সে মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলো। চিকিৎসা সম্পর্কে তিনি জানান, “শিমলা হাসপাতালের ডাঃ ফরিদকে দেখানো হয়েছিল। তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেন, জাহিদের কোনো সমস্যা নেই, সে সুস্থ।” পরে কবিরাজি চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন, তবে অসুখের নির্দিষ্ট করে নাম বলতে পারেননি।

ঈদের আগের দিন তাকে কোথায় নেওয়া হয়েছিল জানতে চাইলে ছালমা বলেন, “আমাদের এলাকার মসজিদের এক হাফেজ বালককে দেখানোর জন্য নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু তার আগেই সে নিখোঁজ হয়ে যায়।”

জাহিদ পেশায় ডিস অ্যান্টেনার বিল সংগ্রাহক ছিলেন। তার নিয়োগকর্তা চাটমোহর রেলবাজার এলাকার আলম শিকদারের ছেলে আসলাম শিকদার (৪২) বলেন, “জাহিদ নিয়মিত কাজ করতো। নিখোঁজের আগের দিনও সে বিল সংগ্রহ করে রশিদ জমা দিয়েছে। সে মানসিক রোগী ছিল—এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। তার স্ত্রী এমন কোনো কথা আগে বলেননি।”

রেলবাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান (৪৩) বলেন, “জাহিদ ভদ্র, নম্র ও ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিল। নিয়মিত নামাজ পড়তো। আমরা তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক আচরণ দেখিনি।”

জাহিদের ভাড়া বাসার মালিক আব্দুল মোমিন (৫৫) বলেন, “সে স্বাভাবিক আচরণ করতো। মানসিক ভারসাম্যহীনদের মতো কোনো লক্ষণ আমি দেখিনি।”

তার প্রতিবেশী এক নারী বলেন, “জাহিদ খুব ভদ্র ছিল, মাথা নিচু করে চলাফেরা করতো। তার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা দেখিনি।”

তদন্ত কর্মকর্তা নগরবাড়ি নৌ পুলিশের এসআই মো. আইনুল বলেন, “দেশে তেলের সংকট থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে, ফলে তদন্ত কিছুটা ধীরগতিতে চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট সকলকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।”


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ