সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা এখন ধু-ধু বালুচর



রনি ইমরান, পাবনাঃ নদীতে বলবান স্রোত নেই , নেই ভরা রূপের জলরাশি।  যে দিকে চোখ যায় বিবর্ণ ধু ধু বালুচর। পাবনা সদর ঘেঁষে ৩০ কিলোমিটার এঁকেবেঁকে বয়ে চলা পদ্মার বুকে মাইলের পর মাইল জেগেছে বিস্তীর্ণ চর। বুধবার ১৩ মে পাবনার দক্ষিণে বয়ে চলা পদ্মা নদীতে দেখা যায়,  শুকিয়ে চৌচির পদ্মায় সারি সারি আটকে আছে নৌকা। নদীর জেগে ওঠা চরে গড়ে উঠেছে ফসলি খেত খামার বাগান গরু মহিষের বাতান। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়াতে। নদীর ৬০ ফুট গভীর  থেকে পাম্প বসিয়ে পানি তুলে জমিতে সেচ কাজ করছে কৃষকরা।  প্রকাশ্যে চালছে অবৈধ বালু মাটি কাটার প্রতিযোগিতা। প্রতিদিন শত শত গাড়ি মাটি বালু অবৈধ ভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে নদীর বুক থেকে। নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে অর্ধশত ইট ভাটা। পানিশূন্য পদ্মার বুকে চলছে যন্ত্রচালিত বাহন।

পাবনা সদরের কোমরপুর ঘাট এলাকায় দেখা গেছে, প্রায় সাড়ে ৫ কিলোমিটার প্রশস্ত নদীর ৪ কিলোমিটার এলাকা যন্ত্রচালিত বাহনে পারি দিয়ে যাত্রীদের নৌকায় চড়তে হচ্ছে মাত্র ১ কিলোমিটার। ভরা বর্ষায় নদীতে পানি থাকলেও বছরের বাকি সময়গুলো শুধু ধু ধু চর জেগে থাকে। পাবনা উত্তরাঞ্চলীয় পানি পরিমাপ বিভাগ সূত্র থেকে জানা যায়, পাবনা হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে চলতি মে মাসের গত দশ দিনের রেকর্ডকৃত মোট পানিপ্রবাহ ছিল ৭৪৩৫৭৮ কিউসেক।  এই পয়েন্ট দিয়ে দিনে গড়ে ৭৪৩৫৮ কিউসেক পানি প্রভাবিত হয়েছে পদ্মায়।  পানি না থাকায় পদ্মার সঙ্গে মিশে থাকা নদীপাড়ের মানুষের জীবন জীবিকা ও পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। 

স্থানীয় জেলে মোঃ শহিদ সরদার বলেন, পদ্মায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সারাদিন জাল ফেলে ১ থেকে ২ কেজির বেশি মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই উপার্জন না থাকায় অনেকেই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। জেলে মোঃ অপেল বলেন, কয়েক বছর আগে জাল ফেলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ কেজি মাছ পেতাম এই নদীতে। এখন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত জাল ফেলে ২ কেজির বেশি মাছ পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে অন্য কাজ করে সংসার চালাতে হচ্ছে।

নদীতে জেলেদের অবৈধ্য চায়না জালে মাছ ধরতে দেখা যায়। ছোট ফাঁসযুক্ত এটি দিয়ে পোনা মাছের পাশাপাশি নির্বিচারে বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ ধরে  জীববৈচিত্র্য হুমকিতে নিয়ে যাচ্ছে তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জেলে  জানায়, পানি কম থাকায় নদীতে এমনিতে মাছ পাই না। চায়না জালে মাছ মেরে কোনমতে সংসার চালানোর খরচ ওঠে।  পদ্মায় পানি কম থাকায় পাবনার নদ নদী বিলসহ ২০টি ছোট বড় খাল বিল প্রায় পানি শূন্য হয়ে পড়েছে।

পদ্মা পাড়ের স্থানীয় বাসিন্দারা  জানান, চার দশক আগেও কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে গর্জন শোনা যেত প্রমত্তা পদ্মার। নদীর ভরা জলরাশিতে চারিদিকে ছিল প্রাণ প্রকৃতির জৌলুস। কিন্তু এখন নদী শুকিয়ে চর জেগে উঠেছে। বর্তমান নদী পাড় থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বলরামপুর গ্রামের ৮০ বছর বয়সী প্রবীণ মোঃ সামছুল জোয়াদ্দার  বলেন, পদ্মা নদীকে আগে কখনো এতটা শুকিয়ে যেতে দেখিনি। কয়েক দশক আগেও পদ্মার গর্জন শুনে রাতে ঘুমাতাম। অনেক বাহারি সব পাল তোলা নৌকা চলতো। জেলেরা দৈত্য সাইজের মাছ ধরে আনতো। নদীর পাশে মানুষের জীবন ছিল সুখ সাচ্ছন্দ আনন্দময় শস্য-শ্যামলা।

পাবনা বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোঃ রাহেদুল ইসলাম বলেন,  পদ্মা নদীতে পানি কম থাকায় জীবজগৎ এবং পরিবেশের উপর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজননে বিভিন্ন সমস্যা হয়। ভূগর্ভস্থ পানি রিচার্জ না হলে নদীর পার্শ্ববর্তী আশেপাশের ৩০ -৪০ কিলোমিটার এলাকায় পানির সঙ্কট দেখা যায়। তিনি আরো বলেন, আগে শুধু শুষ্ক মৌসূমে পদ্মা সঙ্কুচিত হতে দেখা গেলেও এখন শুষ্ক ও বর্ষা দুই মৌসূমেই নদীর আয়তনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। নদীতে আস্তে আস্তে চর পড়ছে আবার যখন বৃষ্টি হচ্ছে এভাবে নদীর ধারণ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। নদীতে পানি আসলে তখন বন্যা ও নদী ভাঙন দেখা দিচ্ছে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ