সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

অব্যবস্থাপনার কারণেই জাবি শিক্ষক জান্নাতুলের মৃত্যু, দাবি রিটার্নিং কর্মকর্তার

বাবা মায়ের সাথে জান্নাতুল ফেরদৌস


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার জন্যই তার সহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে দাবি করে ফয়জুন্নেসা হলের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক সুলতানা আক্তার বলেছেন, ভোট গণনার দায়িত্ব পালনে গিয়ে মারা যাওয়া শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস ‘অসুস্থ’ ছিলেন এবং তাকে গার্ড পাঠিয়ে ডেকে আনা হয়েছে।

শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার জন্যই আমার সহকর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে আমি মনে করি। আমি এ ঘটনার সঠিক বিচার চাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তার ক্ষতিপূরণ দাবি করছি। এই মৃত্যুর দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে নিতে হবে।’

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ—জাকসু নির্বাচনে প্রীতিলতা হলের পোলিং অফিসারের দায়িত্বে ছিলেন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌস।

শুক্রবার সকালে ভোট গণনার দায়িত্ব পালন করতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তার মৃত্যুর বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা সুলতানা আক্তার বলেন, ‘তিনি (জান্নাতুল ফেরদৌস) সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রম করে চাপ নিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলেন। চাপের কারণে তিনি হয়তো ঘুমাতে পারেননি।’

তিনি বলেন, ‘সকালে অসুস্থতার জন্য তিনি আসতে পারেননি। গার্ড পাঠিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। আসার পর তিনি তিন তলায় উঠতে গিয়ে পড়ে যান। কিছুক্ষণ পরেই তার মৃত্যু হয়, হাসপাতালে নেওয়ার আগেই।’

জাকসু নির্বাচনে ভোট গণনা কক্ষে ইত্তেফাকের পাবনা প্রতিনিধির একমাত্র কণ্যা ও জাবি শিক্ষক জান্নাতুলের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জান্নাতুলের মৃত্যুর খবরে পাবনার সাংবাদিকসহ সকল মহলে এবং জাবিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

জানা গেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের ভোট গুনতে গুনতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফেরদৌস (৩০)। শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকালে অসুস্থ অবস্থায় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুর খবরে ছড়িয়ে পড়লে ভোট গণনার কক্ষে নির্বাচনে দায়িত্বরত পোলিং কর্মকর্তাদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন।

অকাল মৃত্যুর খবরে বাড়িতে শোকের মাতম

জান্নাতুল ফেরদৌসের বাড়ি পাবনা শহরে। তিনি পাবনা প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি, অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক ও বর্তমানে ইত্তেফাকের পাবনা জেলা প্রতিনিধি রুমি খন্দকারের একমাত্র মেয়ে। জান্নাতুল ফেরদৌস জাকসু ও প্রীতিলতা হল সংসদ নির্বাচনে পোলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

জান্নাতুল ফেরদৌসের মৃত্যুর খবরে শুক্রবার  সকালে ভোট গণনার কক্ষে শোকাবহ আবহ তৈরি হয়। নির্বাচনের দায়িত্বরত পোলিং কর্মকর্তাদের অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওই সময় নির্বাচন কমিশনার রেজোয়ানা করিম (স্নিগ্ধা) মাইকে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে আমি আপনাদের সবার কাছে অনুরোধ করব, ওনার (জান্নাতুল) জন্য দোয়া করবেন। এই মুহূর্তে আমরা যেহেতু একটা কাজের মধ্যে আছি, আমরা চাইলেও কাজটি অসম্পূর্ণ রাখতে পারছি না। আমাদের এই কাজটাও চালিয়ে যেতে হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ওই শিক্ষক যে হলে (প্রীতিলতা) দায়িত্বরত ছিলেন, সেটির ভোট গণনার প্রক্রিয়াটি এগিয়ে এনে দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা করছি।’

চারুকলা বিভাগের সভাপতি শামীম রেজা বলেন, আমি প্রীতিলতা হলে রিটার্নিং অফিসার ও জান্নাতুল ফেরদৌস পোলিং অফিসার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। গতকাল (বৃহস্পতিবার) ভোট গ্রহণ শেষে সন্ধ্যা ছয়টার পর তিনি (জান্নাতুল) বাসায় চলে যান। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে আটটার দিকে ভোট গণনার জন্য তিনি সিনেট ভবনে আসেন। এরপর তৃতীয় তলায় ভোট গণনার কক্ষের দরজার সামনে হঠাৎ পড়ে যান। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ভোট গণনার কাজের জন্য আমি সকালেই তাঁকে ফোন দিয়ে এনেছিলাম।

সহকর্মীরা ছুটে যান বাসায়

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বলেন, রাতে সবাই ক্লান্ত হওয়ায় ও পোলিং এজেন্ট না থাকায় একসাথে সব হল সংসদের গণনা শেষ করা যায়নি। জান্নাতুল অন্যান্য সহকর্মীসহ ভোট গণনাকেন্দ্রে গিয়েছিলেন। সিনেট হলের দরজার সামনে এসেই তিনি পড়ে যান। তার মৃত্যুর ঘটনায় আমাদের মধ্যে শোকাবহ পরিবেশ বিরাজ করছে। আমি শোকসন্তপ্ত পরিবারের কাছে সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।

জান্নাতুলের বাবা রুমি খন্দকারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি একমাত্র সন্তানের মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি জানান, জান্নাতুল মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। পাবনা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় হতে এসএসসি, সরকারি মহিলা কলেজ হতে এইচএসসি পাশের পর জাবিতে চারুকলা বিভাগে ভর্তি হয়। চারুকলা থেকে কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও মাষ্টার্স ডিগ্রী অর্জনের পর সেখানেই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। মাত্র ছয় মাস আগে সাভার এলাকার একই বিভাগের সহপাঠি সিরাজুল ইসলাম মাসুমের সাথে জান্নাতুলের বিয়ে রেজিষ্ট্রী হয়। আগামী বছরের ৫ জানুয়ারী আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে উঠিয়ে দেওয়ার তারিখ নিধ্যারণ হয়েছিল বলে জানান তিনি।

শুক্রবার বাদ জুম্মা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জানাযার পর মরহুমা জান্নাতুলের মরদেহ পাবনা আনা হয়। সেখানে কাচারিপাড়া জামে মসজিদে বাদ এশা জানাযার পর পাবনার আরিফপুর কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

মৌমিতার মৃত্যুতে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, জামায়াতের পাবনা সদরের এমপি প্রার্থী প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন, পাবনা প্রেসক্লাব সভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার সাধারন সম্পাদক জহুরুল ইসলাম সাবেক সভাপতি এবিএম ফজলুর রহমান, শেকড় ফাউন্ডেশনের সভাপতি খান এ হাবিবেব মোস্তফাসহ গোটা সাংবাদিক সমাজ তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।  

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ