পাবনার ঈশ্বরদীর সাহাপুরে গত চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত সুমন মণ্ডলের মৃত্যুকে স্রেফ ‘গণপিটুনি’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে মূল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে ঈশ্বরদী থানায় মামলা দায়ের করেছেন নিহতের স্ত্রী মোছা. লাবণী খাতুন। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করে ৭ দফা দাবি উত্থাপন করেছে নিহতের পরিবার।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে নিহতের পরিবার জানায়, গত ২ আগস্ট রবিবার রাত আনুমানিক ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে মোবাইল ফোনে কল করে সুমন মণ্ডলকে ঘটনাস্থলে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে আটকে রেখে রাতভর হাত-পা বেঁধে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। নিহতের শরীরে মারাত্মক আঘাতের পাশাপাশি মাথা, হাত ও পায়ে পেরেক ঢুকিয়ে এবং কানে রক্ত ঢুকিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করার মতো ভয়াবহ অভিযোগ তোলে পরিবার। মুমূর্ষু অবস্থায় সুমন পানি পানের আকুতি জানালেও তাকে একফোটা পানি পর্যন্ত দেওয়া হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের পক্ষ থেকে তদন্ত প্রক্রিয়া ও আলামত গায়েব নিয়ে বেশ কিছু গুরুতর প্রশ্ন ও অভিযোগ তোলা হয়:
মামলা থেকে আসামির নাম বাদ: নিহতের পরিবারের দাবি, ঘটনার সাথে জড়িত মূল ৫ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও ঘটনার সাথে জেলা বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতার ভাতিজা তুহিন মেম্বার সরাসরি সম্পৃক্ত থাকায় রহস্যজনকভাবে এজাহার থেকে তুহিন সহ দুইজনের নাম বাদ দিয়ে মাত্র তিনজনের নাম রাখা হয়েছে। কার নির্দেশে বা কিসের চাপে তদন্তের আগেই অভিযুক্তদের নাম বাদ দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের পরিবার।
মোবাইল ফোন গায়েব ও রহস্যজনক ভূমিকা: নিহতের মোবাইল ফোনটি মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত হলেও তা উদ্ধার নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর পর প্রায় তিন দিন ফোনটি চালু ছিল। সেসময় কল করা হলে ‘এসআই রিপন’ পরিচয়ে একজন জানান যে, এক অপরিচিত ব্যক্তি ফোনটি থানায় জমা দিয়েছেন। অথচ পরবর্তীতে থানায় খোঁজ নিলে পুলিশ জানায়, সেখানে কোনো ফোন জমা পড়েনি। পুলিশের এই অসঙ্গতিপূর্ণ ভূমিকা ও ফোন উদ্ধারে অনীহা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে পরিবার।
ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শী: ঘটনার সময় একাধিক মানুষ উপস্থিত থাকলেও কাউকে কেন ভিডিও বা ছবি তুলতে দেওয়া হলো না—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়া আংশিক ভিডিওতে ৪-৫ জনকে বেধড়ক মারধর করতে দেখা গেলেও পুরো রাতের নির্যাতনের দৃশ্য গায়েব করার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার নীরবতা ও আসামিদের অধরা থাকা: ঘটনার ৮ দিন পার হয়ে গেলেও পুলিশ কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। এমনকি তদন্তকারী কর্মকর্তা (এসআই জামাল উদ্দিন) পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন না বলেও অভিযোগ করা হয়।
নিহতের পরিবারের পক্ষে বক্তারা বলেন, সুমনের বিরুদ্ধে অতীতে চুরির মামলা থাকলেও আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে নির্যাতন করে মেরে ফেলার অধিকার কারও নেই। সুমনের অবুঝ দুটি অবোধ শিশুর ভবিষ্যতের দায় কে নেবে—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তারা বলেন, “আমরা কোনো নিরপরাধ মানুষকে ফাঁসাতে চাই না, কিন্তু প্রভাব বা অর্থের জোরে প্রকৃত অপরাধীরা যাতে পার না পায়।”
সংবাদ সম্মেলন থেকে পরিবার ও এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে ৭ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়:
১. সুমন মণ্ডলের মৃত্যুর ঘটনায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে।
২. ঘটনাটি গণপিটুনি নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড—তা নির্ধারণে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করতে হবে।
৩. ঘটনার সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সকলকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনতে হবে।
৪. পাওয়া ভিডিও ফুটেজের উৎস অনুসন্ধানের পাশাপাশি ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ভিডিও ও ডিজিটাল প্রমাণ উদ্ধার করতে হবে।
৫. নিহতের মোবাইল ফোন দ্রুত উদ্ধার করে ফরেনসিক পরীক্ষা এবং এর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৬. এজাহার থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার কারণ তদন্তপূর্বক প্রকাশ করতে হবে।
৭. হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষপর্যায়ে নিহতের স্ত্রী লাবণী খাতুন ও পরিবার ‘গণপিটুনি’ শব্দের আড়ালে হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা না দিয়ে প্রশাসনকে প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানান।
অভিযুক্তদের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের সকলের ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।
এবিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার পরপরই নিহতের স্ত্রী বাদী হয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন, তারই ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ ও তদন্ত সাপেক্ষে এজহার ভুক্ত ও অন্যান্য যারা ঘটনার সাথে জড়িত তাদের গ্রেফতারের জন্য পুলিশ তৎপর আছে।
.jpg)
