পাবনার দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলা প্রমত্তা পদ্মা নদীতে ক্রমেই পানি বাড়ছে। গত দুদিনের ব্যবধানে নদী অববাহিকায় ০.৩৫ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। পদ্মায় পানি বাড়তেই চরের কৃষকরা ক্ষেত থেকে তাঁদের উৎপাদিত শাকসবজি ও ফলমূল দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছেন।
বুধবার (২৯ জুলাই) পাবনা সদরের কোমরপুর পদ্মা অঞ্চলে গিয়ে দেখা যায়, মাইলের পর মাইল নদীর বুকে জেগে ওঠা ধু-ধু বালুচর পানিতে পূর্ণ হয়ে উঠছে। নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলের শত শত বিঘা ফসলি জমি ও কলার বাগান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চাষিরা দ্রুত ক্ষেতের ফসল নৌকায় তুলে তীরে নিয়ে আসছেন।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাবনায় নদ-নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মা নদীতে পানির সমতল রেকর্ড করা হয়েছে ১০.৭৪ সেন্টিমিটার, যা চলতি মাসের গত ২২ তারিখ ছিল ১০.৩৯ সেন্টিমিটার। নদীটিতে এখনও পানি বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে ০.৩৫ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর পাবনার উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামানিক বলেন, পাবনার চরাঞ্চলে প্রায় ৭ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হয়েছে। নদীতে পানি বাড়লেও চরাঞ্চলের কোন কোন ক্ষেত ডুবে যাচ্ছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য তৈরির কাজ চলছে।
কোমরপুর এলাকার কলাচাষি মো. সাজু হোসেন জানান, এবার তিনি প্রায় ৩০ বিঘা চরের জমিতে কলার বাগান করেছিলেন। সাধারণত চরের উঁচু স্থানে কলার বাগান হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে ঠিকমতো সেচ দেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ওপর মশার আক্রমণে বেশিরভাগ কলার গায়ে কালো ছোপ ছোপ দাগ দেখা দিয়েছে। এখন যেভাবে নদীর পানি বাড়ছে, তাতে বাগান ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় কাঁচা-পাকা সব কলা নৌকায় করে দ্রুত সরিয়ে নিচ্ছেন। ৩০ বিঘা জমিতে তাঁর ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মতো খরচ হলেও সেই উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
বর্তমানে চরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত কৃষি পণ্য শ্যালা নৌকায় করে নদীর তীরে আনা হচ্ছে। নদীর চরাঞ্চল থেকে কয়েকটি কলার বাগান কেনা স্থানীয় ব্যাপারি মো. আতিয়ার জানান, কলার বাগান থেকে কলাভর্তি নৌকা সরাসরি গাড়িতে তুলে ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রির উদ্দেশ্যে পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁরা।
এদিকে সরজমিনে দেখা গেছে, কোমরপুর এলাকায় পদ্মা নদীর পেটের ভেতর সারি সারি গড়ে উঠেছে ডজনখানেক অবৈধ ইটভাটা। শুষ্ক মৌসুমে নদীর বুক থেকে বেআইনিভাবে মাটি কেটে এসব ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করা হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি আসার সাথে সাথেই নদীর পাড় দ্রুত ভাঙতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, পদ্মায় পানি বাড়তেই নদীতীরে দর্শনার্থীদের আনাগোনা বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই পাবনা সদরের কোমরপুর পদ্মাঘাটে দর্শনার্থীদের ব্যাপক ভিড় দেখা যায়। স্রোতের কারণে জেগে থাকা বালুচর ভাঙতে শুরু করলেও নদীর পাড়ের উপরিভাগ দেখে বোঝার উপায় নেই যে তলদেশের বালু সরে গিয়ে বড় ধরনের গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ সেই পাড় দিয়েই শত শত দর্শনার্থী অসাবধানতাবশত ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কেউ সেলফি তুলছেন আবার কেউ ভিডিও করছেন। নদীর পাড় ধসে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে পাবনা শহরের প্রবীণ সাংবাদিক সুশীল কুমার তরফদার বলেন, নদীর পাড়ে ঘুরতে যাওয়া দর্শনার্থীদের নিজেদেরই আগে সচেতন হতে হবে। তা না হলে অসাবধানতাবশত যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদ বা প্রাণহানি ঘটে যেতে পারে।
.jpg)
_20250816_164158172.jpg)