পাবনা মানসিক হাসপাতালে দুই রোগীর মারামারিতে একজন নিহত

0

 


পাবনা মানসিক হাসপাতালে ওয়ার্ডের ভেতরে দুই রোগীর মারামারিতে একজন নিহত হয়েছেন। এমন ঘটনায় হাসপাতালে স্পর্শকাতর রোগীদের নিরাপত্তা ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো।


গত ২ জুন হাসপাতালের আবাসিক ওয়ার্ডে মধ্যরাতে ঘটনা ঘটলেও তা সম্প্রতি প্রকাশ পেয়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ।


ভুক্তভোগীর পরিবার ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ২ জুন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া খোঁজাখালির আব্দুল মালেকের ছেলে নাজমুল (২৮) ও ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের মৃত গোলাম নবীর ছেলে ইনজামুল হককে (২৬) অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নং ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়।


এরপর রাত তিনটার দিকে নাজমুল ও ইনজামুল মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান ইনজামুল। গুরুতর আহত হন নাজমুলও।


হত্যায় অভিযুক্ত নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন বলেন, দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী অসুস্থ। কিন্তু ইদানি তার আচরণ আমাদের পক্ষে আর সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই তাকে সুস্থ করতে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম, এখন সে খুনের আসামি হয়ে গেল।


তিনি আরও বলেন, আমার স্বামীকে যখন ভর্তি করি, তখন স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে তিনি মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে মারধর করতে পারেন। সেই অনুযায়ীই তো তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। তারা যদি রোগীকে সামলাতে নাই পারত, তবে তারা আমাদের সরাসরি বলতে পারত। আমরাই অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতাম। কিন্তু তা না করে কেন তার ওপর এমন নির্যাতন করা হলো।


নাজমুলের বাবা আব্দুল মালেক বলেন, ওরা আমার ছেলেকে মারধর করে হাত-পা ভেঙে দিয়েছে। হাসপাতাল থেকে ফোন করে আমাকে বলা হলো, ‘আপনার ছেলে অসুস্থ, এসে নিয়ে যান।’ এরপর তারা ঢাকার মানসিক হাসপাতালে রেফার করার সব কাগজপত্র ও ওষুধের স্লিপ রেডি করে আমার ছেলেকে রিলিজ (ছাড়পত্র) দিয়ে দেয়। আমি গাড়িতে ওঠার সময় হঠাৎ তারা বড় ডাক্তারের কাছ থেকে আরও কিছু ওষুধ লিখিয়ে দেওয়ার নাম করে আমার কাছ থেকে কাগজপত্রগুলো ফেরত নেয়। এরপর আমার ছেলেকে গাড়ি থেকে জোরপূর্বক টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে আবার ভেতরে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে।


এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাজমুলকে অভিযুক্ত করে নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক পাবনা সদর থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে ইজাজুলের দাবি, নাজমুল নয় রোগীর নিরাপত্তায় চরম গাফিলতি ও ব্যর্থতার দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই।


তিনি বলেন, যে ছেলেটা আমার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে, সেও তো মানসিক রোগী। এমন দুজন রোগীকে তারা কেন একসঙ্গে রাখল। যখন তারা মারামারি করছিল তারা কেন থামাতে পারল না। আমি সেবাকর্মীদের কাছে জানতে চাইলে বলেছে, তারা ভয়ে মারামারি থামাতে যায়নি।


চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করে তীব্র জনবল সংকটকে দায়ী করছেন সেবাকর্মী ও চিকিৎসকরা। আর অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের আইসোলেশনে রাখার ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত ত্রুটি স্বীকার করে অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন খোদ পরিচালক।


পাবনা মানসিক হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রেখা আক্তার জানান, অনেক সময় রোগীদের দেখে স্বাভাবিক মনে হলেও তারা হঠাৎ করেই চরম সহিংস আচরণ শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে একজন-দুজন নার্সের পক্ষে রোগীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।


তিনি আরও জানান, হাসপাতালে পুরুষ সেবাকর্মীর তীব্র সংকট রয়েছে। মানসিক রোগী সামলানোর জন্য আলাদা কোনো প্রশিক্ষণ বা ঝুঁকিভাতা নেই। তাই সদিচ্ছা থাকলেও প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।


পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ জানান, যে রোগীরা মারামারি করেছেন তারা আগেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেছে। মৃত্যুর ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য হাসপাতালে পৃথক কোনো আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। সীমিত জনবল নিয়ে এই ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।


জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রামদুলাল ভৌমিক বলেন, দেশের এই বিশেষায়িত হাসপাতালে প্রায়শই রোগী মৃত্যুর ঘটনায় সামগ্রিক সেবা পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বছরের পর বছর ধরে এসব ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, যা মানসিক রোগীদের প্রতি এক প্রকার রাষ্ট্রীয় অবহেলা। স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের প্রাণহানি এড়াতে সরকার ও স্বাস্থ্য বিভাগের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা জরুরি।


পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কাজ করছে পুলিশ। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি রোগীর মানসিক অসুস্থতা ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top