সর্বশেষ

6/recent/ticker-posts

পাবনার এক স্কুল শিক্ষক ও নীল বিদ্রোহ



।। মঈন কাদেরী।।


১৯৩০ সালের বর্ষাকালে, পাবনার এক স্কুল শিক্ষক রাহমত আলী কলকাতার ব্রিটিশ রেজিস্ট্রি অফিসের বাইরে এক পুরনো টিনের ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুষল ধারে বৃষ্টি পড়ছিলো, রাস্তা প্রায় ডুবে যাচ্ছিলো। তার সুতির জামা চপচপে ভেজা, কিন্তু তিনি ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি শুধু পাসপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছিলেন না, তার সঙ্গে ছিল তার মানুষের ন্যায়বিচার ও আশা।

যখন তার নাম ডাকা হয়, তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন এবং একটি কালো বাঁধাই করা ব্রিটিশ ভারতীয় পাসপোর্ট হাতে পান। মোড়কের উপর লেখা ছিল ‘ব্রিটিশ সাবজেক্ট’ শব্দগুলো, যা ছিল সাম্রাজ্যের শাসনের প্রতীক, মুক্তির চিহ্ন নয়।

রাহমত বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেননি। তিনি সত্য কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করতেন। তিনি চেয়েছিলেন বাঙালি কৃষকদের জন্য ন্যায়বিচার, যারা অনেক বছর ধরে অত্যাচারের শিকার।

তখনকার সময় বাঙালি কৃষকদের অনেকেই বাধ্য হয়ে নীল চাষ করতেন—নীল, এমন একটি গাছ যেখান থেকে নীল রঙের রঞ্জন তৈরি হত। ব্রিটিশরা এর মাধ্যমে লাভবান হচ্ছিলেন, কিন্তু কৃষকরা ধান চাষ করতে পারছিলেন না। তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে ক্ষুধার্ত জীবন যাপন করছিলেন। এই কৃষকরা ছিলেন হিন্দু, মুসলিম ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের, তবে সবাই একই কষ্টে ভুগছিলেন।

রাহমত পবনার একটি গৌরবময় ইতিহাসের সন্তান। ১৮৭০-এর দশকে পাবনা “ভাড়াটে বিদ্রোহ” নামে এক শান্তিপূর্ণ কৃষক আন্দোলন হয়েছিল। কৃষকরা ভাড়ার ন্যায্যতা ও জমির অধিকার দাবী করেছিল। এর ফলে ১৮৮৫ সালে বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্ট পাস হয়, যা ভাড়াটে কৃষকদের কিছু সুরক্ষা দেয়।

রাহমত এই ইতিহাস নিয়ে গর্ব করতেন। কলকাতায় যাওয়ার আগে তিনি মাওলভী আজহার আলী মিঞা-কে দেখেন, যিনি তখন বয়স্ক হলেও অত্যন্ত সম্মানিত একজন আইনজীবী ছিলেন।

মাওলভী আজহার আলী মিঞা পাবনার শাতবিলা গ্রাম, পোস্ট অফিস সাঁথিয়া এলাকার একজন প্রখ্যাত আইনজীবী (প্লীডার) ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ক্যালকাটা হাইকোর্টে আইন চর্চা করেছেন এবং পাবনা ও কলকাতায় তাঁর আইন চেম্বার ছিল। ১৯৩৭ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি বেঙ্গল লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন, পাবনা পূর্ব (গ্রামীণ) মুসলিম কেন্দ্র থেকে। মানুষের অধিকার রক্ষায় এবং মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় তিনি কাজ করেছেন। তিনি ১২ এপ্রিল ১৯৬১ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

রাহমত যখন তাঁর উদ্দেশ্য জানালেন, মাওলভী আজহার আলী মিঞা বললেন:

“তুমি সত্যের সন্ধানী এক ভূমির সন্তান। স্পষ্টভাবে কথা বলো। তোমার হাতে যে সত্য আছে তা গুরুত্বপূর্ণ।”

কলকাতায় রাহমত একটি অপ্রত্যাশিত মিত্র পান—এলিজা মার্টিন, The Statesman-এর তরুণ ব্রিটিশ সাংবাদিক। তাঁর সম্পাদক তাঁকে নিরপেক্ষ থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু এলিজা রাহমতের কাহিনী শুনে এবং মানুষের কষ্টের চিঠিপত্র দেখে চুপ থাকতে পারেননি।

তারা একসঙ্গে পাবনা গিয়েছিলেন এবং নীল চাষের প্রকৃত অবস্থা দেখেন। এলিজা, আমিনা বেগমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যাঁর স্বামী নীল চাষের শোষণে মারা গিয়েছিলেন। তিনি নীল দাগ থাকা শিশুদের হাত এবং খালি খাদ্যভাণ্ডারের ছবি দেখেন। একজন হিন্দু পুরোহিতও স্বীকার করেন, তিনি কখনো ভাবেননি যে নীল চাষ এত কষ্টের কারণ হবে।

এলিজা একটি শক্তিশালী প্রতিবেদন লিখেন:

“নীল ক্ষেতের রক্ত”

১৯৩০ সালে The Statesman-এ প্রকাশিত এই প্রতিবেদন বাংলার বাইরে এবং লন্ডনের ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কক্ষে পৌঁছায়।

প্রতিবেদনটি অনেক আলোড়ন সৃষ্টি করে। যদিও সাম্রাজ্য গ্রামীণ শোষণের বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিল, সত্য আজ প্রকাশিত হয়। ১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে জোরপূর্বক নীল চাষ বন্ধ হতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন হয়।

রাহমত কখনো তার পাসপোর্ট ব্যবহার করেননি, তবে তার হাতে সেই ছোট্ট বই ছিল সত্যের বাহক।

এটি বহন করেছিল তার মানুষের কষ্টের কাহিনী,

এবং তা ছিল স্বাধীনতার বীজ।


তথ্যসূত্র ও ঐতিহাসিক তথ্য

নীল চাষ: বাঙালিরা চাপিয়ে দেওয়া রঞ্জন গাছ, যা খাদ্য চাষের বিকল্প ছিল না।

পবনা ভাড়াটে বিদ্রোহ (১৮৭৩–৭৬): জমিদার শোষণের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন, যা বেঙ্গল টেন্যান্সি অ্যাক্ট ১৮৮৫ এর পথ সুগম করে।

মাওলভী আজহার আলী মিঞা (১৮৮০–১৯৬১): পবনার প্রখ্যাত আইনজীবী ও সংসদ সদস্য, যিনি ১৯৩৭ সালে নির্বাচিত হন।

The Statesman: ব্রিটিশ ভারতের একটি প্রধান ইংরেজি পত্রিকা, যা মাঝে মাঝে গ্রামীণ বিষয়ে প্রতিবেদন করতো।

লেখক: মঈন কাদেরী, লন্ডন প্রবাসী।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ