।। এবিএম ফজলুর রহমান।।
সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি সমাজের বিবেক, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। একজন প্রকৃত সাংবাদিক তাঁর লেখনী, সততা ও নির্ভীক অবস্থানের মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করেন এবং মানুষের অধিকার ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটান। পাবনার সাংবাদিকতা অঙ্গনে এমনই একজন স্মরণীয় ও বরণীয় ব্যক্তিত্ব শফিউর রহমান খান। তিনি তাঁর নিষ্ঠা, পেশাদারিত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধের মাধ্যমে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার জগতে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টাষ্ট স্থাপন করেছেন। শফিউর রহমান খান দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সংবাদকে কেবল তথ্য পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সমাজের নানা অসঙ্গতি, মানুষের সমস্যা এবং উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সাহসিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। তাঁর লেখনী ছিল তথ্যনির্ভর, বস্তুনিষ্ঠ, মজলুমের কন্ঠস্বর ও জনকল্যাণমুখী। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন সাংবাদিকের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব হলো সত্যকে নির্ভয়ে মানুষের সামনে তুলে ধরা।
আজ ৩১ জুলাই, এই ক্ষণজন্মা সাংবাদিকের ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর স্মরণে তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ইছামতি, সাপ্তাাহিক পাবনা বার্তা তার জামাতা প্রতিষ্ঠিত দৈনিক সিনসা ও পাবনা প্রেসক্লাবে দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
স্বাধীনতার আগে ও পরে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন শফিউর রহমান খান। ব্যক্তি জীবনের সততা ও নৈতিক দৃঢ়তা তাঁর লেখনীকে করেছে বিশ্বাসযোগ্য। ব্যক্তিস্বার্থ বা বৈষয়িক লাভের চেয়ে সাধারণ মানুষের অধিকার, সমস্যা ও প্রত্যাশাকেই তিনি সংবাদ ও লেখনির মূল বিষয়বস্তু করেছেন।
অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন ছিল তাঁর বৈশিষ্ট্য। বিলাসিতা ও বাহুল্য থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন সব সময়। তাঁর কর্মস্থল কিংবা ব্যক্তিগত বসার ঘর ছিল সাধারণ, কিন্তু চিন্তা ও আদর্শ ছিল অসাধারণ। এ কারণেই আজও পাবনার সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের স্মৃতিতে চির অম্লান।
১৯৩১ সালের ২৩ ডিসেম্বর পাবনা জেলার বেড়া উপজেলার টাংবাড়ি গ্রামে তাঁর জন্ম। শত প্রতিকুলতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করে তিনি সাংবাদিকতাকেই জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নেন।
১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত পাবনা পত্রিকা-এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং একই বছরে সাপ্তাহিক আমাদের কথা-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে পাবনা থেকে সাপ্তাহিক পাবনা বার্তা প্রকাশ করেন এবং ১৯৯১ সালে জেলার প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ‘দৈনিক ইছামতি’ প্রকাশের মাধ্যমে স্থানীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেন।
সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮৪ সালে যমুনা সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯২ সালে ভাস্কর উপাধি এবং ১৯৯৪ সালে উত্তরণ পুরস্কার লাভ করেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক, মানবাধিকার ও সাংগঠনিক কর্মকান্ডে অগ্রণী ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা, পাবনা জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম, পাবনা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, বাংলাদেশ এডিটরস ফোরামের সদস্য, ভাসানী স্মৃতি পরিষদ, পাবনা জেলা শাখার সভাপতি এবং বাংলাদেশ আঞ্চলিক সংবাদপত্র পরিষদের সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পাবনা প্রেসক্লাবেরও একজন গুরুত্বপুর্ন সদস্য ছিলেন।
রাজনৈতিক দর্শনে তিনি ছিলেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত। পরে ভাসানী ন্যাপ প্রথমে জাগদল ও পরবর্তিতে বাংলাদেশ জাতিয়তাবাদি দল (বিএনপি) তে যোগ দেয়। তিনি পাবনা জেলা বিএনপিরও একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
পাবনার সাংবাদিকতা জগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি শুধু নিজে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের দক্ষ, সৎ ও দায়িত্বশীল হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর পরামর্শ, অভিজ্ঞতা এবং আন্তরিক সহযোগিতা অনেক তরুণ সাংবাদিককে পেশাগত জীবনে এগিয়ে যেতে সাহস ও অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এ কারণেই অনেকেই তাঁকে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকতার ‘বাতিঘর’ হিসেবে অভিহিত করেন।
একজন সাংবাদিকের সবেচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতা। শফিউর রহমান খান সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকে আজীবন ধারণ করেছেন। পেশাগত সততা, নিরপেক্ষতা এবং নৈতিকতার প্রশ্নে তিনি কখনো আপোস করেননি। তাঁর সংবাদ মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন ছিল জনস্বার্থকেন্দ্রিক এবং দায়িত্বশীল। ফলে পাঠকসমাজ ও সহকর্মীদের কাছে তিনি একজন আস্থাভাজন সাংবাদিক হিসেবে বিশেষ সম্মান অর্জন করেন।
জেলায় প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাবনার সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করেন। বর্তমান প্রজন্মের বহু সাংবাদিক তাঁর হাত ধরেই সাংবাদিকতা জীবনে প্রবেশ করেছেন এবং আজও বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীলতার প্রতীক হয়ে রয়েছেন।
মৃত্যুর দুই যুগেরও বেশি সময় পর আজও শফিউর রহমান খানের সততা, আদর্শ ও পেশাদারিত্ব পাবনার সাংবাদিক সমাজের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে রয়েছে। তাঁর কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মের সাংবাদিকদের জন্য পথ প্রদর্শক হয়ে থাকবে।
লেখক : এবিএম ফজলুর রহমান, সাবেক সভাপতি, পাবনা প্রেসক্লাব ও স্টাফ রিপোর্টার, সমকাল, পাবনা।
.jpg)
