আসাদুজ্জামান ফরিদপুর, পাবনা: একসময় তাঁর হাতে ছিল গাছের চারা, কাঁধে থাকত কোদাল। রাস্তার পাশে, বাড়ির আশপাশে কিংবা পতিত জমিতে যেখানে একটু জায়গা পেয়েছেন, সেখানেই গাছ লাগিয়েছেন। নিজের সংসারের অভাব-অনটন ভুলে প্রকৃতিকে সবুজ করে তোলাই ছিল তাঁর নেশা। কিন্তু সেই বৃক্ষপ্রেমী ইদ্রিস আলী এখন নিজেই যেন জীবনের কঠিন বাস্তবতার কাছে অসহায়।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার চিথুলিয়া গ্রামের এই মানুষটি কয়েক দশক ধরে গাছ লাগিয়ে ও পরিচর্যা করে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন ‘বৃক্ষপ্রেমী ইদ্রিস’ হিসেবে। দীর্ঘ জীবনে তিনি অসংখ্য গাছ লাগিয়েছেন। এর মধ্যে শত শত বটগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
জানা যায়, ১৯৮০ সালের দিকে গাছ লাগানোর কাজ শুরু করেন ইদ্রিস আলী। এরপর থেকে গাছ লাগানো তাঁর জীবনের অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে ওঠে। অর্থের অভাব থাকলেও গাছ লাগানোর আগ্রহে কখনো ভাটা পড়েনি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চারা সংগ্রহ করেছেন, গাছ লাগিয়েছেন এবং সেগুলোর পরিচর্যা করেছেন।
পেশায় তিনি দর্জি। শুধু গ্রামের হাটের দিন লুঙ্গি সেলাইয়ের কাজ করতেন। সেই সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি গাছের পেছনেও অর্থ ও শ্রম ব্যয় করেছেন। গাছকে ভালবেসে সে কখনো বিয়ে করেনি। গাছগুলো যেন তার সংসার তার সন্তান। তাইতো তিনি এখনো চিরকুমার। গাছকে তিনি শুধু প্রকৃতির অংশ হিসেবে দেখেননি, দেখেছেন নিজের সন্তানের মতো। কোনো গাছ শুকিয়ে গেলে কিংবা কেটে ফেলা হলে কষ্ট পেতেন। এমনকি বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ প্রয়োজনে মানববন্ধন ও করেছেন।
সময়ের সঙ্গে বয়স বেড়েছে। কমেছে কাজ করার শক্তি,আয়-রোজগার নেই। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে ইদ্রিস আলীর ভাগ্নে সাভার গ্রামের সাবেক মেম্বার আব্দুর রউফ ও তার স্ত্রী সালমা খাতুন এখন তার দেখাশোনা করেন । একসময় যে মানুষটি অন্যের জন্য ছায়া তৈরি করতে গাছ লাগিয়েছেন, আজ তাঁর নিজের জীবনেই নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া।
বয়স ও অসুস্থতার কারণে ইদ্রিস আলীর জীবন এখন অনেকটাই নির্ভরশীল। চিকিৎসা, খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। তাঁর অসহায় জীবন নিয়ে অতীতেও বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেক মানবিক মানুষ ও প্রতিষ্ঠান।
২০২১ সালে তাঁর অসহায় জীবনের খবর প্রকাশের পর তাঁকে একটি পরিবেশবান্ধব ঘর উপহার দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও জীবিকার নিশ্চয়তা না থাকলে একজন প্রবীণ মানুষের জীবন কতটা কঠিন হয়ে উঠতে পারে, ইদ্রিস আলীর বর্তমান পরিস্থিতি যেন তারই উদাহরণ। ইদ্রিস আলীর বাড়িতে পানির কোন ব্যবস্থা না থাকায় অন্যের বাড়ি থেকে পানি সংগ্রহ করে নিত্য প্রয়োজনে কাজ করে। নিজের শক্তি না থাকায় অন্যের সহযোগিতায় টিউবওয়েল চেপে পানি সংগ্রহ করতে হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সরকারি দপ্তরে যোগাযোগ করেও একটি সাবমারসিবল পাম্পের ব্যবস্থা করতে পারেননি তিনি। ইদ্রিস আলীর সাথে কথা হলে তিনি জানান পানির একটু ব্যবস্থা হলে শেষ জীবনটা একটু আরামে চলতে পারেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইদ্রিস আলীর মতো একজন মানুষ শুধু নিজের জন্য বাঁচেননি। তিনি বছরের পর বছর পরিবেশের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর লাগানো গাছ আজ বহু মানুষের ছায়া, পাখির আশ্রয় এবং প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ। অথচ সেই বৃক্ষপ্রেমী মানুষটির জীবনের শেষ সময়গুলো যদি অভাব-অনটনে কাটে, তা সত্যিই দুঃখজনক।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সাধারণ মানুষকে গাছ লাগানোর আহ্বান জানানো হয় প্রতিনিয়ত। কিন্তু যাঁরা জীবনের দীর্ঘ সময় গাছ লাগানো ও পরিচর্যায় উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর—ইদ্রিস আলীর জীবন সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে।
প্রকৃতির জন্য যিনি নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে তাঁর প্রয়োজন একটু সহযোগিতা, চিকিৎসা ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও পরিবেশপ্রেমীরা এগিয়ে এলে বৃক্ষপ্রেমী ইদ্রিস আলীর অসহায় জীবন কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে।
.jpg)
