পাবনায় ১৩ মাসে ৫৯ খুন, ৭১ ধর্ষণ

0

 


পাবনা জেলার গত ১৩ মাসের অপরাধচিত্রে উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের জুন (প্রথম ২২ দিন) পর্যন্ত জেলাটিতে মোট ৫৯ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে অন্তত ৭১টি। এ ছাড়া উল্লিখিত সময়ে তিনটি দুর্ধর্ষ ডাকাতি সংঘটিত হয়েছে। জেলা পুলিশের দেওয়া তথ্যে এসব অপরাধ সম্পর্কে জানা গেছে। 


মাসওয়ারি তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের জুন মাসে কোনো ডাকাতি না হলেও খুনের ঘটনা ঘটে ৪টি এবং ধর্ষণ সংঘটিত হয় ৮টি। পরবর্তী মাস জুলাইয়ে জেলাটিতে একটি ডাকাতি, দুটি খুন এবং সর্বোচ্চ ১২টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। আগস্টে জেলাটিতে কোনো ডাকাতি হয়নি, পাঁচটি খুন এবং পাঁচটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেপ্টেম্বর মাসে জেলায় কোনো ডাকাতি হয়নি। তবে ২টি  খুন এবং ৭টি ধর্ষণের  ঘটনা ঘটে। অক্টোবর মাসে আবারও অপরাধ বৃদ্ধি পায়– কোনো ডাকাতি না হলেও ৬টি খুন ও ৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া নভেম্বর মাসে একটি ডাকাতি, চারটি খুন ও ছয়টি ধর্ষণ এবং বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে ১টি ডাকাতি, ৭টি খুন ও ৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।


নতুন বছর ২০২৬ সালের শুরুতেও অপরাধের এই ধারা অব্যাহত ছিল। জানুয়ারি মাসে কোনো ডাকাতি বা ধর্ষণ না হলেও ৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফেব্রুয়ারি মাসে জেলায় ৪টি খুন ও ৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তবে কোনো ডাকাতি হয়নি। মার্চ মাসে ডাকাতি না থাকলেও ৫টি খুন ও ৩টি ধর্ষণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়। এপ্রিল মাসে কোনো ডাকাতি না হলেও ৫টি খুনের ঘটনা এবং ৬টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। মে মাসেও জেলায় কোনো ডাকাতি হয়নি। তবে ২টি খুন এবং ৫টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে।


সর্বশেষ চলতি ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রথম ২২ দিনেই পাবনায় অন্তত ৭ জনের খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যার শিকার এক স্কুলছাত্রীও রয়েছে। আরও আছেন গুলিতে নিহত চরমপন্থি নেতা, ছুরিকাঘাতে নিহত কলেজছাত্র, অগ্নিদগ্ধ তিন যুবক, মানসিক হাসপাতালের এক রোগী এবং পৃথক ঘটনায় নিহত আরও দুজন। অল্প সময়ের ব্যবধানে ধারাবাহিক এসব ঘটনা এবং এতগুলো আলোচিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংস মৃত্যুর ঘটনা জেলার মানুষের মধ্যে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে, যা সামগ্রিকভাবে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 


স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাবনার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মাহাতাব উদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ‘একের পর এক হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করছে। এসব অপরাধের ঘটনায় মানুষের নিরাপত্তাবোধ দুর্বল হয়ে পড়ছে।’ পাবনা প্রেসক্লাবের সভাপতি আখতারুজ্জামান  আখতার বলেন, ‘আলোচিত প্রতিটি ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’


পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) বলেন, জেলায় অপরাধ দমনে পুলিশ অত্যন্ত তৎপর রয়েছে। প্রতিটি ঘটনার পর অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে খুনের সংখ্যা বেশি মনে হলেও প্রতিটি ঘটনার পেছনে ভিন্ন ও বিচ্ছিন্ন পটভূমি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 


তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের বড় অংশই পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক অসুস্থতা, স্বজনদের বিরোধ এবং নৈতিক অবক্ষয়জনিত কারণে ঘটেছে। এমনকি নিজেদের অসাবধানতায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও খুনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি জানান, কিছু ক্ষেত্রে স্বাভাবিক বা অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর পরও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে খুনের মামলা করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো মূলত সামাজিক অবক্ষয়ের ফল, যা কেবল পুলিশি শক্তি বা আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে দমন করা সম্ভব নয়। তাই ঢালাওভাবে একে আইন-শৃঙ্খলার অবনতি না বলে, অপরাধগুলোর পেছনের ভিন্নধর্মী কারণ ও সামাজিক সংকটকে বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। 


তিনি বলেন, সীমিত জনবল নিয়েও জেলা পুলিশ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দিন-রাত আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের সামাজিক অপরাধ রুখতে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি পুলিশ স্থানীয় কমিউনিটির সহায়তা নিচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা। জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দেন। সূত্র: খবরের কাগজ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top