।।এবাদত আলী।।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় এবং বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে ঐ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যায়। এ দিকে মুক্তিযুদ্ধকে তরাম্বিত করার লক্ষ্যে ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিব নগর সরকার গঠন করা হয় এবং ১৭ এপ্রিল এই মুজিব নগরে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল ভারতের আগরতলায় এক বৈঠকে ২৮ জন এম পির উপস্থিতিতে সর্বপ্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয় এবং পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রনমুক্ত কষ্টিয়া জেলার সীমাস্তবর্তী মহকুমা শহর চুয়াডাঙা অথবা মেহেরপুর শহর কে বাংলাদেশের অস্থায়ী রাজধানী ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ঐ বৈঠকে ১৪ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু এই গোপন সংবাদ বিদেশী সাংবাদিকরা জেনে ফেলায় দেখা দেয় বিপত্তি। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে এ সংবাদ প্রচারের পর পরই চুয়াডাঙা শহর পাকিস্তানি বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়। পাকিস্তান বিমান বাহিনীর জঙ্গী বিমান থেকে চুয়াডাঙার উপর ব্যাপক ভাবে বোমা হামলা চালাতে থাকলে ১৫ এপ্রিল চুয়াডাঙা পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। সে কারণে বাধ্য হয়েই শপথ গ্রহণের তারিখ ১৪ এপ্রিলের পরিবর্তে ১৭ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়।
আর স্থান নির্বাচন করা হয় মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার আম্রকাননে। এদিন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী হলেন তাজ উদ্দিন আহমেদ। ঐতিহাসিক এই আম্রকাননে দেশ-বিদেশের সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এক অনাড়ম্বর অথচ মনোঞ্জ অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীসভার সদস্যদেরকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে অর্থ দপ্তরের মন্ত্রী, এ এইচ এম কামরুজ্জামান কে স্বরাষ্ট্র-এান ও পুনর্বাসন মন্ত্রী, খন্দকার মোস্তাক আহমদকে পর রাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রী এবং এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয়। চীপ অফ ষ্টাফ হিসাবে আবদুর রবের নাম ঘোষণা করা হয়।
এই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে দিনাজপুর হতে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারী পার্টির চীপ হুইপ অধ্যাপক ইউছুফ আলী বিপ্লবী সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এ সময় প্রায় শতাধিক দেশী- বিদেশী সাংবাদিক ও আশে পাশের এলাকার প্রায় হাজার পাঁচেক ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। নাতিদীর্ঘ এই অনুষ্ঠানে আনসার ও ই পি আর বাহিনীর দু টি পৃথক প্লাটুনের কাছ থেকে প্রথমে উপ রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অভিবাদন গ্রহণ করেন। সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশিত হয়। এর পর পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজ উদ্দিন আহমেদ কুষ্টিয়া জেলার মেহের পুর মহকুমার বৈদ্যনাথ তলার ভবের পাড়া গ্রামের নাম পরিবর্তন করে মুজিবনগর নামকরণ করেন। গার্ড অফ অনারের নেতৃত্বে ছিলেন ঝিনাইদহের তৎকালীন এসডিপিও মাহবুব উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানের স্থানীয় ব্যবস্থাপনায় ছিলেন মেহেরপুর মহকুমার তদানিন্তন এস ডি ও তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী। সার্বক্ষণিক সহযোগিতায় ছিলেন ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজের অধ্যাপক শফিকুল্লাহ। অনুষ্ঠান পরিচালনার সামগ্রিক দায়িত্বে ছিলেন টাংগাইল থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য অ্যাডঃ আবদুল মান্নান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর মুজিবনগর সরকারের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এখানে গড়ে তোলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৈৗধ ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্স।
(লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।

0 মন্তব্যসমূহ